Wednesday, 23 May 2018

হিমালয়ের কোলে এবার (2006) ভাগ 2

বাপরে ! কত ভিড় ; শুধু মাথা আর মাথা আর এই জনসমুদ্রের মাঝখানে আমরা কজন রিতিমত কয়েক ফোঁটা জল কণা II এসবের মধ্যে দিয়ে সাপের মতো পথে খুবই ধীর গতিতে লাইন এগিয়ে ছোলেছে মূল ফাটকের দিকে II দেখতে দেখতে ঘণ্টা দুই পেড়িয়ে গেলো ; আর যেন তর সইছে না এবার তবু ধৈর্য ধরে দাড়ীয়ে রয়েছি প্রধানত তিনটি কারণে – 
১। মা এর বকুনির ভয় ।। 
২। পরিবেশটাই এমনই যে কিছু মনে হচ্ছে না ।। 
৩। একটা পুরনো কথার প্রভাব , কষ্ট করলে নাকি কেষ্ট পাওয়া যায় ( যদিও কেষ্ট আজ কিছু দুরে দাড়িয়ে আমার থেকে )।।
এরই মধ্যে একটি এমণ খবর আমার উৎসাহ কে আরও দ্বিগুণ করে তুললো ; মন্দিরে আজ পূজো দিতে এসেছেন অভিনেত্রী হেমা মালিনী ।। তিনি মন্দির থেকে বেড়োলে তারপর লাইন আবার চলতে শুরু করবে ।। 
নিকুচি করেছে লাইনের , আজ হেমা দিদির সাথে ছবি না তুলে ছাড়ছি না – এমনই সাত পাঁচ ভেবে চলেছি যখন ; ঠিক তখনি জনতার প্রবল উৎসাহ ভরা শব্দ আর চিৎকার জানান দিয়ে গেলো তিনি আসছেন ; তাও এপথেই ।। ব্যাস ! এক লাফ দিয়ে ; সবাইকে ঠেলে সরিয়ে সোজা মন্দিরের দালানে গিয়ে হাজির হলাম ; শুধু তাই নয় তার পিছন পিছন সোজা দৌড় মেরেছি তখন ।। ভাগ্যিস সিকিউরিটি আটকে দিল তাই ; নাহলে একটা ছবির নেশায় জুতো পরেই মন্দিরে দালানে উঠে পরেছিলাম আজ ।। সত্যি কতটা পাগল আমি ।। 
যাই হোক সোনার দরজা দুটি খুলে দেওয়া হল এবার সাধারনের জন্য ।। ওরা তো অসাধারন ; তাই ওদের জন্য বিশেষ ব্যাবস্থা করা হয় আর আমরা গরমে ঘেমে , বৃষ্টিতে ভিজে ছুটে চলি দর্শনে ।। 
মন্দির থেকে বেড়তে আরও আধ ঘণ্টা লেগে গেল ।। এতক্ষণে বাইরের তাপমাত্রা বেশ আনেকটাই কমে এসেছে আর এদিকে পেটে ইঁদুর দৌড় শুরু হয়ে গেছে ; সুতরাং ফিরে চল বাছাধন নিজের বাসায় ; আই মিন হোটেলে ।। বিকেলে আবার বেরোনো যাবে ।। ধুর ! এত জলদি ফিরে যাব বললেই হল , জাতটির নাম বাঙালি – ঘুরতে এসে কেনাকাটা না করলে রুটি হজম হবে না ।। হ্যাঁ , প্রচুর কেনাকাটি করার পর আজকের লাঞ্চ বাইরেই করে নেবো ঠিক করা হল – মেনু , তন্দুরি রটি আর ডাল মাখনি সাথে প্রচুর পেয়াজ ।। 
দুপুরের ঘুমতা ছোট হলে কি হবে বেশ ভালো হয়েছে কিন্তু ; যদিও তার রিএক্সন মোটেই ভালো হল না আজ ।। ঘুম যখন ভাংল তখন বিকেল পাঁচটা ; অনেক চেষ্টা করে লেপ আর আমার মধ্যে আজ যখন বিচ্ছেদ ঘটানো গেলো না তখন এক প্রকার বাধ্য হয়েই বাকিরা গেলো মানা দেখতে ।। মানা , সেটা কি ? বলছি , আগে বাকিদের বেরিয়ে যেতে দিন কারন বাবা তো রয়েছেই সঙ্গে , এ পথে বহুবার এসেছেন আগে ।। তারই মুখ থেকে শুনতে শুনতে চলো বেরিয়ে পড়ি শতপন্থ স্বারগারহিনি ভ্রমণে ।। কথিত আছে এই পথেই পঞ্চ পাণ্ডব স্বর্গ যাত্রা করেছিলো ।। এই সেই জায়গা বলা হয় যেখানে স্বর্গ যাওয়ার সিঁড়ি আছে ।। 
“ বাবা , এই স্বারগারহিনি যায় কোন রাস্তা দিয়ে ?”
বাবা হেসে বললো , “ আগে ওঠ , দু কাপ চা বলে আয় ... চা খেতে খেতে সব বলছি ।। “ এটুকু শোনা শেষ না হতেই দরজা খুলে হাক পারলাম , “ চায় , দো কাপ ... “ ।। শরিরে তখন কেমন যেন আমেজ খেলা করছে , যেন নিজেই যাব এবার ওই অচেনা পথে ।।

 

Tuesday, 22 May 2018

হিমালয়ের কোলে এবার (2006) ভাগ 1

গল্পটার কোনো শুরু নেই কিন্তু , আগে ভাগেই বলে রাখলাম । বাড়িতে দিদিরা বেড়াতে এসেছে , তাদের মুখে শুনলাম তারা পাহাড়ে যাচ্ছে । আরে বাবা , পাহাড় মানে কেদার , বদ্রি এই সব , সোজা ভাষায় যাকে বলে হিমালয় ।। শুনেই লাফিয়ে উঠলাম ।। বাবা মাউন্টেনার ছিলেন । বাবার কাছে অনেক গল্প শুনেছি , তবে নিজে কোনোদিন যায়নি । বাবা অবশ্য এতো সহজে রাজি হয়ে যাবে বুঝতে পারি নি ।। মাস তিনেক আগেই রিজার্ভেশন করা হল ।। মোট আট জন ;আমি, বাবা আর মা ; বড়দি ও জামাইবাবু ; মেজ জেঠু ও দাদা ও অশোক দা ।। সময়টা শীতের আগেই , আই মিন সেপ্টেম্বর মাস । প্রথম গন্তব্য দিল্লি , ছোর দির বাড়ি ।। সেখান থেকে গাড়ি করে বেরিয়ে পরব আমরা পর্বত দর্শনে ।। 
দিন টা লক্ষ্মী পুজোর দিন । মায়ের নাম নিয়ে আসানসোল স্টেশন পৌছালাম । ট্রেন সাতটা ত্রিশ এর হাওড়া নিউ দিল্লি সুপার ফাস্ট এক্সপ্রেস ।। কিন্তু গিয়ে শুনলাম ট্রেন হাওড়া ছাড়েনি তখনও । যা ! যাওয়া হবে তো ।। সালটা 2006 । ট্রেন ছাড়ার অপেক্ষায় বসে কত লোক ।। অবশেষে রাত দশটায় ঘোষণা হলো ট্রেন হাওড়া ছেড়েছে ।। প্রাণে যেন প্রাণ এলো আমাদের ।। গাড়ি পৌছালো রাত সাড়ে বারোটা । সিট পেলাম , গাড়ি পেলাম ঠিকই কিন্তু ঝামেলা পিছু ছাড়ে না ।। ট্রেনের টিটি টিকিট এ একটা বড় খুত আবিষ্কার করেছেন ।। আর পায় কে ! একটা সিট অবশেষে ছাড়তে হলো আমাদের । এতক্ষনে একটু শান্ত হলো সব । ততক্ষনে বাইরে তাকিয়ে দেখি ধানবাদ পেরিয়ে গেছে গাড়ি , রাত বেশ গভীর ।। আর কি ঘুম হয় ! 
ভোর বেলায় ট্রেন পৌছালো শোন ব্রিজ , দেহরি অন সন । কি বিশাল সেতু ! আমি দেখছি আর ভাবছি , কত কিছুই দেখা বাকি এখনো আমার । ভোর পাঁচটায় মুঘলসরাই । এখনও তো অনেক বাকি ।। রাতের আনা খাবার খেয়েই চালিয়ে দিতে হবে ।
দাদার হাতে জাদু আছে । বিরিয়ানিটা দারুন করেছে কিন্তু । দু চামচের জায়গায় পুরো ছ চামচ মেরে দিলাম ।। এবার একটু হালকা ঘুম , যাকে বলে ভাত ঘুম আর তার পর সন্ধ্যের মধ্যে দিল্লি ।
দিল্লি পৌঁছাতে হয়ে গেলো রাত আটটা ।। পুরো সিক্স আওয়ার লেট ।। ঠিক হলো দিদির ওখানে রাত কাটিয়ে কাল সকালে ব্রেকফাস্ট সেরে বেরিয়ে পরা যাবে । বিকালে লক্ষ্য নৈনিতাল , সেখানেই দুদিন হল্ট ।। সন্ধ্যেবেলা যখন নৈনিতাল পৌছালাম সে এক অপরূপ দৃশ্য ।। আর যে ঘর বুক করা হল সেটি কাঠের কটেজ ।। যা লাগছে না মাইরি ।। বাইরে ঠান্ডা , ভিতরে লেপের তলায় কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছি তার ঠিক নেই ।।
পরেরদিন সকাল সকাল পৌঁছে গেছি ঝিলের ধারে ।। অসম্ভব সুন্দর ।। সেখানে রয়েছে নৈনি মাতার মন্দির ।। ইনার নাম অনুসারে তালটি মানে ঝিলটির নাম নৈনিতাল ।। সেখানে আবার বোটিং ও করা যায় , সুতরাং , আর কি চাই !! সকাল কাটলো দারুন ভাবে ।। মোহাব্বতে গাছের পাতার চাদরে বসে আড্ডা মেরে আর ঝিলে নৌকা বিহার করে ।। 
নৈনিতাল ছাড়া এখানে আছে ভিমতাল , সাততাল ও নুকুচিয়াতাল ।। এগুলো অবশ্য খুব কাছথেকে দেখি নি , তবে পরের দিন ফিরতি পথে ওই ভিউপয়েন্ট থেকে দেখেছিলাম ।। অসম্ভব সুন্দর দৃশ্য ।। চারখাম্বা , ফালুট শৃঙ্গ দূর থেকে ধরা দিচ্ছিল চোখের সামনে ।। 
নৈনিতাল ছাড়লাম সকাল দশটা ।। এবার গন্তব্য কৌসানি ।।
পৌঁছাতে যথেষ্ট রাত হয়ে গেল ।। তা একটা হোটেল দেখে ঢুকে পড়লাম । সেরাত কাটিয়ে পরদিন তার পাশেই গান্ধীআশ্রমে রুম নিলাম ।। সেই পরিবেশ , বাগান আর তার থেকে বড় সেখানকার আদব কায়দা , সব মন ছুঁয়ে যায় ।। ডরমিটরি পেলেও কোন অসুবিধে ছিল না ।। সন্ধ্যার প্রার্থনা সভা , মনে হচ্ছিল পাহাড়ের বুকে এক সফল সন্ধ্যা ।। 
পরদিন সকালে ঠিক হল কাছাকাছি কোথাও ঘুরে আসা যাক , সাইড সিন তেমন সাথ না দিলেও , রাস্তা পরিষ্কার ছিল ।। পৌছালাম বইজনাথ ।। এর পাশ দিয়ে গোমতী নদী বয়ে গেছে ।। বলে নাকি এই খানেই শিব পার্বতীর বিয়ে হয়েছিল ।। সত্যি কি মিথ্যে জানি না , তবে এই নদীর জলে নানা রঙের মাছ ঘুরে বেড়াচ্ছে দেখলাম ।। অপরূপ শোভা এই স্থানের ; যারা দেখেনি তাদের বলে বোঝাতে পারবো না ।। বিকেলে আবার ফিরে এলাম কৌসানি ।। ছেড়ে যেতে ইচ্ছে তো করছে না তোমায় , তবু কাল প্রস্থানের পথে এগোতে হবে আর এবার গাড়ি দৌড়াবে বদ্রি বিশালের পথে ।। 
সকাল সকাল উঠে পড়েছি , যেটুকু এনজয় করা যায় আর কি ।। চারদিক কুয়াশায় মোরা ।। মনে হচ্ছে , কেউ তাকে মেকআপ করে ছেড়ে দিয়েছে ।। ওদিকে স্করপিও ও রেডি ।। হর্ন মারছে মানে জয় বদ্রি বিশাল বলে বেরিয়ে পর ।। রাতে টার্গেট বদরিনাথ ।।
এই !! গান শুনতে শুনতে ভুলেই গেছিলাম বলতে কত পাহাড় , উঠলাম আর নামলাম ।। মন্দাকিনির হাত ধরে ছুটে চলেছে গাড়ি ।। কখনো তেল ভরছে , আবার দৌড় শুরু ।। রাস্তা , সে অপরূপ ।। পুরো প্রাকৃতিক , ডান দিকে পাহাড় আর পাথর আর নিচে মন্দাকিনির সাদা জলধারা ।। আর রাস্তা পুরো প্রাকৃতিক ।। পাথুরে রাস্তায় , ঝুলে থাকা পাথরের পাহাড় ; দেখলেও ভয় হয় ।। যখন এক একটা বাঁক ঘুরে ঘুরে ওপরের দিকে উঠছিলাম মনে হচ্ছিল সত্য অর্থে এটি হাই ওয়ে , ন্যাচারাল হাই ওয়ে ।। 
আর থাকা যাচ্ছিল না ।। গাড়িটাও এই পাহাড়ের গোড়ায় পাংকচার হতে হল ।। তবে না হলে এই বিউটি চোখে দেখা হত না ।। ভয় মিশ্রিত এক আনন্দ গ্রাস করেছে ।। মুখে বদ্রি বিশাল এর নাম আর বুকে পাগলামির নেশা ।। এ সুন্দরীর বুকে আজ মৃত্য এলেও শান্তি ।। 
ওই আবার হর্ন দিচ্ছে গাড়িটা ।। আর একটু দেরি করলে হত না !! এই প্রকৃতির খুবসুরত রূপ ছেড়ে যেতে মন চায় না ।। তবু চলাটাই জীবন ।। কিছু ফটো তুলে আবার গাড়িতে চেপে বসলাম ।। 
গানের সাথে সাথে গাড়িও চলছে দ্রুত গতিতে ।। সাপের মত একে বেঁকে উঠছে আবার নামছে ।। কখনো ডান দিকে নদী তো কখনো বাম দিকে ।। মাউন্টেন সিকনেস এ ভুগছি বেশ , তবু এ যাত্রার মজাটাই আলাদা ।। মুখে মুখে গান , বুকে ধ্বনিত জয় বদ্রি বিশাল ।। সাদা জলের ধারা খাদের নিচে আর স্করপিওর চাকা খাদের কিনারা ধরে দৌড়ে চলেছে ।। অবশেষে হাজির হলাম রুদ্রপ্রয়াগ ।। সেখানে দুপুরে খাবার খেয়ে আবার যাত্রা শুরু ।। 
এই রুদ্রপ্রয়াগে আলোকনন্দা ও মন্দাকিনি মিশেছে আর গঙ্গা হয়ে প্রবাহিত হচ্ছে ।। সুতরাং এবার আলোকনন্দা ধরে যাত্রা শুরু ।। 
জোশিমঠ পেরিয়ে যে রূপ দেখলাম তা সত্যি মনমুগ্ধকর ।। এখানে আছে আদি কেদার এর মন্দির ।। বলা হয় শীতে প্রচন্ড বরফের জন্য মন্দির বন্ধ থাকে এবং এই জোশিমঠএ তখন বদ্রি বিশালের পুজো হয় ।। রাত আট টা নাগাদ গাড়ি থামল , তবে এবার নারায়ণের ধাম ; বদ্রিবিশাল ।। 
রাত কাটলো , বাবার ডাকে ।। উঠেই তো আমি থ -- একি স্বপ্ন না সত্যি ।। সাদা পোশাকে দাঁড়িয়ে আছে জানালার বাইরে সোনালী টুপি মাথায় জড়িয়ে ।। পর্বত মহারাজের জয় , প্রকৃতির জয় , বদ্রি বিশাল-এর জয় ।। জীবন স্বার্থক মনে হচ্ছে আজ ।।দেখেছেন তো , আপনাদের সাথে কথা বলতে বলতে ভুলেই গেছি যে সবাই মন্দিরে যাওয়ার জন্য প্রায় রেডি ; একমাত্র এই আমি ছাড়া II সুতরাং , আর নো কথা ; জল এখনো গরম আছে , স্নানে ঢুকলাম আমি II
“ এ কাঞ্চা , টোপী কিতনে কা দিয়া ?” 
“ সাহাব , পাঁচ কা এক II ” ---
কি বিশ্বাস হল না তো ! আমারও হচ্ছিল না II হোটেল থেকে বেড়িয়েই দেখি এক বাচ্চা ছেলে পাহাড়ি ভেড়ার লোম দিয়ে হাতে বানানো টুপি বেচছে II সস্তায় পেয়ে গোটা দশেক টুপি কিনে নিয়েই দৌড় দিলাম সবার পিছন পিছন ; এক কাঞ্চির দেখানো পথে মন্দিরের দিকে II